
দ্রুত নির্বাচনের চাপ
- আপলোড সময় : ১৫-০১-২০২৫ ১০:৩৪:৩৬ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৫-০১-২০২৫ ১০:৩৪:৩৬ পূর্বাহ্ন


* ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের
* জামায়াতের বক্তব্য, অতি জরুরি সংস্কারগুলো শেষ করে বর্তমান সরকার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে যার যার জায়গায় চলে যান
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পাঁচ মাস পার হয়েছে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার। তবে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার কত দিন দায়িত্ব পালন করবে, রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার কবে নাগাদ সম্পন্ন হবে, কবে নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠা হবে এ প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে না থাকা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগে মন্দা, প্রশাসনে অস্থিরতা, পরাজিত শক্তির নানা অপকৌশল এসব নানা কারণে সরকারের ওপর দ্রুত নির্বাচন দেয়ার চাপ প্রবল হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকেও চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর কাছ থেকে এ চাপ বেশি আসছে। এককথায় বলতে গেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন দিতে সরকারকে চাপ দিচ্ছে রাজনীতিক দলগুলো।
জানা গেছে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর নির্বাচন ব্যবস্থাসহ রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কারে বিভিন্ন কমিশন গঠন করা হয়। দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন করতে দাবি তুলেন। গত রোববার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জানান, আগামী দেড় বছরের মধ্যে যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে তা যাতে এ যাবৎকালের সেরা হয়, সেই লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার কাজ করছে। তিনি বলেন, আমরা এটিকে (নির্বাচনকে) একটি উদাহরণ, একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ হিসেবে নজির গড়তে চাই। গত রোববার নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকোন আরাল্ড গুলব্র্যান্ডসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। এর পরিপেক্ষিতেই রাজনীতিক দলগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচনের দাবি করছে।
চলতি বছরের জুলাই মাসের মধ্যেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব বলে মনে করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সভা মনে করে যেহেতু নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে গঠিত হয়েছে সেহেতু জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার কারণ নেই। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রশ্ন ওঠে না। ২০২৫ সালের জুলাই মাসের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব।’ সভা এ বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সব রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐকমত্যে আসার আহ্বান জানায়। তিনি বলেন, আমরা বারবার বলছি যে, নির্বাচিত সরকারের কোনো বিকল্প নেই। এটা গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট বিষয়। আমরা মনে করি যে, এ বছরের মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ জুলাই-আগস্টের মধ্যেই নির্বাচন সম্ভব। তিনি আরও বলেন, এ কারণে আমরা সরকারকে আহ্বান জানাতে চাচ্ছি, নির্বাচন কমিশনকেও আহ্বান জানাচ্ছি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিও আহ্বান জানাচ্ছি, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এ বছরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবস্থা নিতে পারি। একইসুরে কথা বলেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সচিব রুহুল কবির রিজভী। প্রধান উপদেষ্টাকে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেন, দ্রুত নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করুন। জাতীয় সংসদ, সংবিধান, পুলিশ প্রশাসন ও জনপ্রশাসনসহ সবকিছুতে সংস্কারের প্রয়োজন। তবে এটা নিয়ে তর্ক-বিতর্কের মধ্যে থাকলে প্রধান উদ্দেশ্য অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত পিছিয়ে পড়বে। এসময় তিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে উদ্দেশ্য করে বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করুন।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল হক বলেছেন, পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হলেও অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দল ও জনগণের নজিরবিহীন বিপুল সমর্থনকে উপযুক্তভাবে কাজে লাগাতে পারছে না। নিজেদের আসল কাজে প্রয়োজনীয় মনোযোগ না দিয়ে তাদের মধ্যে নানাদিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মনে হয়, মাঝে মধ্যে তারা খেই হারিয়ে ফেলছেন, নন-ইস্যুকে তারা বড় ইস্যু করে তুলছেন। এমতাবস্থায় দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে কালক্ষেপণ করে ক্ষমতার টিকে থাকার চেষ্টা করলে ঝুঁকিতে পড়বে। এমনকী পথও হারাতে পারে। এ সময় আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সংস্কারের নামে ইচ্ছা করে আপনাদের মেয়াদ বাড়াবেন না। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ওয়াকার্স পার্টির দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এরআগে গত সোমবার লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট ডক্টর কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেছেন, দ্রুত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা না করলে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামা হবে। বিএনপি ও জামায়াত নেতারাও প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছেন। বিএনপির পক্ষে বলা হচ্ছে, ২০২৫ সালের মধ্যেই নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জামায়াতের বক্তব্য, অতি জরুরি সংস্কারগুলো শেষ করে বর্তমান সরকার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে যার যার জায়গায় চলে যান। সরকার চাইলে চলতি বছরের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব বলে মনে করছে ছয়টি রাজনৈতিক দলের জোট ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’। সিপিবিও রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত নির্বাচনের দিকে যাবে বলে আশা করছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশে দ্রুত নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে। গত সোমবার পার্শ্ববর্তী বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের সেনাবাহিনীর বার্ষিক সংবাদ সম্মেলনে সে দেশের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় ও সামরিক সম্পর্ক নিয়ে বলেছেন, দুই দেশের পারস্পরিক সার্বিক সম্পর্ক তখনই স্বাভাবিক হবে, যখন সে দেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসবে।
সংস্কার আগে, নাকি নির্বাচন আগে এ নিয়ে অহেতুক বিতর্ক চলতে থাকলে দেশ সংকটের মধ্যে পড়বে বলে সতর্ক করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। তাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরতে শিগগির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে দলটি। এ সময় জাতীয় নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার দাবি জানিয়ে সিপিবির সভাপতি শাহ আলম বলেন, সরকারের সংস্কার প্রস্তাবের উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠন হয়েছে এটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে সংস্কার আগে, নাকি নির্বাচন আগে এ নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করছে কোনো কোনো মহল। সংস্কার ও নির্বাচন সাংঘর্ষিক নয়। এটি একে অপরের পরিপূরক। এটা চলমান প্রক্রিয়া। আগেও স্বৈরাচারী সরকার বলত, গণতন্ত্র চান না উন্নয়ন চান। গণতন্ত্র ও উন্নয়ন সাংঘর্ষিক ছিল না। একই গোলকধাঁধায় ঘুরতে থাকলে সহস্র শহীদের আত্মদানের ফলে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশ সংকটের মধ্যে পড়বে। একইসুরে কথা বলেছেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন (প্রিন্স)। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জরুরি কাজ হলো আর দেরি না করে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা। এর কোনো বিকল্প নেই। অন্তর্বর্তী সরকারকে জনগণের ওপর ভরসা রাখতে হবে। তা না করে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চাইলে নানা অপশক্তি সুযোগ নেবে। তাই নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা, নিত্যপণ্যের দাম কমানো এবং জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। এ বিষয়ে কথা হয় বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান এর সঙ্গে। তিনি বলেন, সব বাধা-বিপত্তিকে পাশ কাটিয়ে যত দ্রুত একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হাঁটবে, ততই ভালো। তিনি বলেন, সকল বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে যত দ্রুত সম্ভব মানুষকে ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি জনগণের নির্বাচিত সরকার গঠন করতে হবে, এই সরকারকে সেই পথে পা রাখতে হবে। যত দ্রুত এগিয়ে যাবে, ততই ভালো।
এদিকে, ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী গোয়েন লুইস বলেছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন কখন হবে, সেটা সরকার ও রাজনৈতিক দল ঠিক করবে। আমরা সময়সীমা নিয়ে কিছু বলতে চাই না। তবে বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহযোগিতা দিতে চায় জাতিসংঘ। এ লক্ষ্যে সংস্থাটি কারিগরিসহ সব ধরনের সহযোগিতা দিতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে গোয়েন লুইস এ কথা বলেন। এ দিন পররাষ্ট্রসচিব এম জসীম উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে গোয়েন লুইস বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কারিগরি সহযোগিতা দিতে আগ্রহী জাতিসংঘ। আজ আমরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গেও বৈঠক করেছি। কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী আমরা সহযোগিতা দেব। এ লক্ষ্যে আমাদের প্রয়োজনীয়তা সমীক্ষা প্রতিনিধিদল কাজ করবে।’
রাজনীতিক দলগুলোর দাবির পরিপেক্ষিতে গতকাল মঙ্গলবার ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা ২০২৫ সালের শেষ থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে নির্বাচনের যে সম্ভাব্য সময়ের কথা বলেছেন, সে অনুযায়ী প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন তারা।’
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ